শেষ অধ্যায়
সেদিন সন্ধ্যায় আরিয়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
রাস্তার দিকে তাকাতেই তার চোখ পড়ল পরিচিত একটি বাদামি শরীরের ওপর।
নিরু।
আগের তুলনায় অনেক শুকিয়ে গেছে। পিঠের লোম এলোমেলো। এক পা একটু টেনে হাঁটছে।
আরিয়ান নিচু হয়ে ডাকল,
"নিরু! এই নিরু! আয় তো!"
নিরু মাথা তুলল।
ডাকটি তার চেনা।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
আরিয়ান একটা বিস্কুট এগিয়ে দিল।
"নে, খা।"
নিরু বিস্কুটটি মুখে নিল। তারপর আরিয়ানের পায়ের কাছে বসে পড়ল।
আরিয়ান তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
"জানিস নিরু, তোকে যদি ঘরে আনতাম, হয়তো এত ঝামেলা হতো না।"
নিরু তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুই তো কখনো এমন করতিস না। একটু খাবার দিলেই খুশি হয়ে যেতিস। কাছে ডাকলে চলে আসতিস।"
আরিয়ান হেসে বলল,
"কিন্তু তোকে ঘরে রাখা সম্ভব ছিল না রে। তুই তো রাস্তার কুকুর।"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আরিয়ান বলল,
"আমার বিড়ালটা দেখতে খুব সুন্দর। কিন্তু কী যে অবিশ্বাসী! একটু আদর করতে গেলেই খামচি দেয়। খাবার নষ্ট করে। কখনো কখনো মনে হয়, এত যত্ন করার পরও ও আমাকে একটুও আপন ভাবে না।"
নিরু তখনো তার পায়ের কাছে বসে ছিল।
আরিয়ান বিস্কুটের প্যাকেট বন্ধ করে বলল,
"আচ্ছা, যা। পরে আবার দেখা হবে।"
নিরু উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু যাওয়ার আগে একবার আরিয়ানের দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ ছিল না।
ছিল শুধু পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আরেকটু সময় পাওয়ার নীরব আকাঙ্ক্ষা।
আরিয়ান ঘরে ফিরে গেল।
নিরু আবার রাস্তায়।
"আরিয়ান নিরুর কাছে ফিরত নিজের প্রয়োজনের সময়। আর নিরু আরিয়ানের কাছে ফিরত নিজের সমস্ত প্রয়োজন ভুলে।”
আরিয়ানের স্বগতোক্তি
এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল।
বিড়ালটি আরিয়ানের বিছানায় শুয়ে ছিল। আরিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে কাচের ওপর।
হঠাৎ তার মনে পড়ল নিরুর কথা।
কত রাত এই বৃষ্টিতে নিরু বাইরে কাটিয়েছে!
কোথায় ঘুমিয়েছে? কী খেয়েছে? কেউ তাকে আশ্রয় দিয়েছে কি না?
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের চিন্তাকে সরিয়ে দিল।
"ও তো রাস্তার কুকুর। এসব ওর জীবনের অংশ।"
সে নিজেকে বোঝাল।
তারপর বিছানার দিকে তাকাল।
বিড়ালটি তার নতুন চাদরের ওপর পা দিয়ে ঘুরছে।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"অদ্ভুত জীবন! যে আমার কাছে কিছুই চাইত না, তাকে আমি ঘরে জায়গা দিলাম না। আর যাকে এত আয়োজন করে ঘরে আনলাম, তার সঙ্গে শান্তিতে থাকতে পারছি না।"
কথাটা বলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বিড়ালটির দিকে তাকিয়ে বলল,
"তুই জানিস, তোকে নিয়ে আমি কত স্বপ্ন দেখেছিলাম? ভেবেছিলাম, সবাই তোকে দেখে খুশি হবে। তুই আমার পাশে বসবি। আমি তোকে নিয়ে ঘুরব। সবাই বলবে, আমার পছন্দ কত সুন্দর!"
সে হেসে উঠল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
"কিন্তু কেউ তো বলেনি, সুন্দর দেখতে হলেই সুন্দর সঙ্গী হওয়া যায় না।"
বিড়ালটি তখন নিজের মতো করে শুয়ে পড়েছে।
আরিয়ান জানালার কাছে ফিরে গেল।
বাইরে কোথাও নিরু হয়তো বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য একটা শুকনো জায়গা খুঁজছে।
কিন্তু আরিয়ানের ঘরে তার জন্য কোনো জায়গা নেই।
নিরুর কোনো ঠিকানা নেই
পরদিন সকালে আরিয়ান বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখল, গেটের পাশে নিরু নেই।
সেদিনও নেই।
তার পরদিনও নেই।
আরিয়ান প্রথম দু-এক দিন বিষয়টি লক্ষ করেনি। কিন্তু একদিন বাজার থেকে ফেরার পথে চায়ের দোকানের বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল,
"চাচা, নিরুকে কয়েক দিন ধরে দেখছি না। কোথায় গেছে?"
বৃদ্ধ দোকানের বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছিলেন।
তিনি বললেন,
"জানি না বাবা। অনেক দিন হলো ওকে দেখি না।"
"অসুস্থ ছিল নাকি?"
"হ্যাঁ, শরীরটা ভালো ছিল না। কয়েক দিন আগে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল।"
আরিয়ান একটু থেমে বলল,
"কেউ খাবার দেয়নি?"
বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।
"সবাই কি আর খাবার দেয় বাবা? কেউ দেয়, কেউ তাড়িয়ে দেয়। ওর তো নিজের কোনো জায়গা নেই।"
আরিয়ান আর কিছু বলল না।
বৃদ্ধ আবার বললেন,
"একটা কথা জানো? ওই কুকুরটা তোমার বাড়ির সামনে সবচেয়ে বেশি বসে থাকত। বৃষ্টি হোক, রোদ হোক, গরম হোক—কোথাও যেত না।"
আরিয়ান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
"তুমি তো ওকে মাঝে মাঝে খাবার দিতে। তাই হয়তো ভাবত, তোমার বাড়ির সামনে বসে থাকলে একটু খাবার পাবে।"
আরিয়ান বলল,
"হ্যাঁ, আমি বিস্কুট দিতাম।"
বৃদ্ধ মৃদু স্বরে বললেন,
"খাবার তো দিতেই। কিন্তু কখনো থাকার জায়গা দিয়েছিলে?"
প্রশ্নটি খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু আরিয়ান উত্তর দিতে পারল না।
সে জানত, নিরু কখনো তার বাড়ির ভেতরে ঢোকেনি। কখনো তার বিছানায় ঘুমায়নি। কখনো বৃষ্টির রাতে তার দরজার আড়ালে আশ্রয় পায়নি।
নিরু শুধু বাইরে বসে থাকত।
আর আরিয়ান যখন চাইত, তখন তাকে ডাকত।
"কিছু অপেক্ষার শেষ হয় না, শুধু একদিন অপেক্ষা করার মানুষটি আর ফিরে আসে না।"
লেখা: নিরব

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন