সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিরু ও কিছু অসমাপ্ত অপেক্ষা (পর্ব -২)

 দ্বিতীয় অধ্যায় | যে অপেক্ষার কোনো শেষ ছিল না

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। পুরোনো বাড়িটার সামনে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছের নিচে বসে আছে নিরু। চোখ দুটো রাস্তার দিকে স্থির। মাঝে মাঝে কোনো গাড়ির শব্দ শুনলেই কান খাড়া করে তাকাচ্ছে।

পাশের চায়ের দোকানের বৃদ্ধ লোকটি নিরুকে বেশ কয়েক দিন ধরেই লক্ষ করছেন।

তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,

"কী রে বাপু, আবার এখানে বসে আছিস? সারাদিন তোকে দেখি এই গেটের সামনে।"

নিরু একবার বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তারপর আবার গেটের দিকে।

বৃদ্ধ একটা শুকনো রুটির টুকরো এগিয়ে দিলেন।

"নে, খেয়ে নে। যার জন্য বসে আছিস, সে তোকে আজও ডাকবে বলে মনে হয় না।"

নিরু রুটির দিকে তাকাল, কিন্তু খেল না।

সে শুধু গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।

হয়তো তার কাছে বাড়ি মানে কোনো চার দেয়াল নয়। বাড়ি মানে একজন মানুষ, যার কাছে ফিরে যাওয়ার একটা অনুমতি আছে।

"নিরুর কোনো বাড়ি ছিল না। তবু সে প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট দরজার সামনে অপেক্ষা করত। কারণ তার কাছে বাড়ি মানে চার দেয়াল নয়, বাড়ি মানে একজন মানুষ।"

সেদিন রাতে আরিয়ান বাড়ি ফিরছিল। গাড়ি থেকে নামতেই নিরু তাকে দেখতে পেল।

"আরে! নিরু! এই নিরু!"

ডাক শুনেই নিরু দৌড়ে গেল। লেজ নাড়তে নাড়তে আরিয়ানের পায়ের কাছে ঘুরতে লাগল।

আরিয়ান হেসে বলল,

"কী রে! এতদিন কোথায় ছিলি? আমাকে একদম ভুলে গেছিস নাকি?"

নিরু তার পায়ের ওপর মাথা রাখল।

"আচ্ছা, আচ্ছা! বুঝেছি। আমাকে খুব মিস করেছিস, তাই না?"

আরিয়ান পকেট থেকে বিস্কুট বের করে দিল।

"নে, খা। আজকে ভালো মুডে আছি।"

নিরু বিস্কুট খেতে লাগল।

আরিয়ান ফোনে কথা বলতে বলতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

"হ্যাঁ, ভাই। বাসায় পৌঁছে গেছি। একটু পরে আসছি।"

তারপর নিরুর দিকে তাকিয়ে বলল,

"যা, এখন যা। কাল আবার দেখা হবে।"

নিরু কয়েক পা এগিয়ে থেমে গেল। একবার পেছনে তাকাল।

আরিয়ান তখন ফোনে ব্যস্ত।

নিরু ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে চলে গেল।

সে জানত না, ভালোবাসা আসলে কী। সে শুধু জানত, এই মানুষটার একটা ডাক তার সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারে।

"একটা ছোট্ট ডাকই নিরুর কাছে হাজার রাতের অবহেলার চেয়ে বড় ছিল।"

পরদিন আরিয়ানের মন ভালো ছিল না।

অফিসে ঝামেলা হয়েছে, বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য, পরিবারের সঙ্গেও কিছুটা দূরত্ব। সব মিলিয়ে তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা।

রাতের খাবার শেষে বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে।

"নিরু! ও নিরু!"

রাস্তার ওপাশ থেকে নিরু ছুটে এল।

"কী রে, ঘুমাচ্ছিলি?"

নিরু লেজ নাড়ল।

"আজকে আমার মনটা ভালো নেই রে। সবাই কেমন যেন বদলে গেছে।"

আরিয়ান নিচু হয়ে নিরুর মাথায় হাত রাখল।

"তুই অন্তত বদলাস না। বুঝলি? তুই থাকিস আমার পাশে।"

নিরু তার হাতের ওপর মুখ রাখল।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

"তুই তো বেশ ভালো শ্রোতা! কিছু বলিস না, শুধু শুনিস।"

সে আরও কিছুক্ষণ নিরুর সঙ্গে বসে থাকল। নিজের জীবনের নানা কথা বলল। নিরু চুপচাপ শুনল।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আরিয়ান একবারও ভাবল না—যে প্রাণীটিকে সে নিজের নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য ডেকেছে, তার নিজের নিঃসঙ্গতার খবর কখনো নিয়েছে কি না।

আরিয়ান নিরুকে মনে করত যখন তার একা লাগত। আর নিরু আরিয়ানকে মনে করত প্রতিটি মুহূর্তে।

কয়েক দিন পর আরিয়ানের বাড়িতে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান।

বাড়ির সামনে আলোকসজ্জা, গেটে ফুলের সাজ, ভেতরে অতিথিদের আনাগোনা।

নিরু যথারীতি গেটের পাশে এসে বসল।

আরিয়ানের ছোট ভাই বাইরে বেরিয়ে এসে বিরক্ত হয়ে বলল,

"আবার এই কুকুরটা এসেছে! ভাইয়া, এটাকে সরাও তো। গেটের সামনে বসে থাকে সবসময়।"

আরিয়ান বাইরে এসে বলল,

"নিরু, যা! আজকে এখানে বসে থাকিস না। অনেক মানুষ আসবে।"

নিরু লেজ নাড়তে নাড়তে কাছে এগিয়ে গেল।

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

"আরে, বলছি তো যা! আজকে তোর জন্য সময় নেই।"

নিরু এবার থেমে গেল।

একটু দূরে সরে দাঁড়াল।

ভেতর থেকে হাসির শব্দ আসছিল। আরিয়ান অতিথিদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছিল।

বৃদ্ধ চায়ের দোকানদার সব দেখছিলেন।

তিনি নিজের মনেই বললেন,

"কেউ কেউ আমাদের কাছে রাখে না ভালোবাসার জন্য, রাখে শুধু নিজেদের নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য।"

কথাটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।

নিরু হয়তো শুনতে পায়নি। কিন্তু তার জীবনের প্রতিটি দিন যেন সেই কথাটারই প্রমাণ।

সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল।

রাস্তার পানি জমে ছোট ছোট পুকুরের মতো হয়ে গেছে। নিরু আশ্রয়ের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। কয়েকটি দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নিতে গিয়েও তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে।

শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো ডাস্টবিনের পাশে এসে থামল।

ডাস্টবিনের পাশে একটা ভাঙা কার্টনের বাক্স পড়ে ছিল। নিরু সেটার ওপর শরীর গুটিয়ে শুয়ে পড়ল।

দূরে আরিয়ানের বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছিল।

হঠাৎ নিরুর মনে হলো, আজ যদি আরিয়ান তাকে ডাকত!

একটু খাবার না হয় নাই দিল। অন্তত গেটের নিচে একটু জায়গা দিলেও তো হতো।

কিন্তু কেউ ডাকল না। নিরু চোখ বন্ধ করল…।

সে কখনো খাবারের জন্য কাঁদেনি, আশ্রয়ের জন্য অভিযোগ করেনি। সে শুধু বুঝতে পারেনি, যে মানুষটির জন্য সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে, তার জীবনে তার কোনো স্থায়ী জায়গা নেই।


দিনের পর দিন একইভাবে কাটতে লাগল।

আরিয়ান কখনো ডাকত, কখনো ভুলে যেত। নিরু কখনো ছুটে যেত, কখনো দূরে বসে থাকত।

একদিন চায়ের দোকানের বৃদ্ধ আরিয়ানকে বললেন,

"বাবা, ওই কুকুরটা তোকে খুব ভালোবাসে মনে হয়।"

আরিয়ান হেসে উত্তর দিল,

"ও তো রাস্তার কুকুর। একটু খাবার দিলেই পেছনে পেছনে ঘোরে।"

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

"খাবার তো অনেকেই দেয় বাবা। কিন্তু সবাই কি কাউকে মনে রাখে?"

আরিয়ান কথাটা শুনে মৃদু হাসল।

"আরে চাচা, কুকুরের আবার এত আবেগ!"

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

শুধু নিরুর দিকে তাকালেন।

নিরু তখন দোকানের এক কোণে বসে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল।

সে ছিল আরিয়ানের অবসরের সঙ্গী, কিন্তু জীবনের অংশ নয়।

সেদিন রাত বারোটার দিকে আরিয়ান আবার নিরুকে ডাকল।

"নিরু! ও নিরু! কোথায় তুই?"

কোনো সাড়া নেই।

"এই নিরু! আয় না। আজকে তোকে খুব দরকার।"

রাস্তার ওপাশে নিরু শুয়ে ছিল।

ডাকটা তার কানে পৌঁছেছিল। সে মাথাও তুলেছিল।

কিন্তু এবার উঠে দাঁড়াল না।

তার শরীর ক্লান্ত। চোখের নিচে জমে থাকা ধুলো আর ময়লা। কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো খাবারও জোটেনি।

আরিয়ান আবার ডাকল।

"কী হলো রে? রাগ করেছিস নাকি?"

নিরু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর মাথাটা আবার মাটিতে রেখে দিল।

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

"ধুর! আজকাল কুকুরটাও কেমন হয়ে গেছে!"

জানালা বন্ধ করে দিল সে।

অথচ নিরু হয়তো প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছিল, কারও প্রয়োজনের সময় প্রিয় হয়ে ওঠা আর কারও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

সেই রাতে নিরু আরিয়ানের বাড়ির দিকে তাকায়নি।

শুধু ডাস্টবিনের পাশের ভাঙা কার্টনের বাক্সটায় শরীর গুটিয়ে নিয়েছিল।





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অপূর্ণতার গল্প

ভাইয়া চল না আজ রাসেল ভাইদের কলেজ থেকে ঘুড়ে আসি,,,,, কেন?? কোন অনুষ্ঠান আছে?? হ্যাঁ,, ভাইয়া,, ঠিক আছে তুই যখন বের হবি তখন আমাকে সাথে নিয়ে যাস,,,,, অনেক দিন পর কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছি...

Tumi chaile piran khan Ft. Jony

Tumi chaile piran khan Ft. Jony Lyric Published : Tafsin ahmed Evan Lyric: তুমি চাইলেই ঠিকি পারতে, ছায়া হয়ে পাশে থাকতে, তুমি পাগল এ আমি টাকে, বুকে জড়িয়ে রাখতে। তুমি চাইলে ঠিকি পারতে, ভালবাসা টুকু বাচিয়ে রাখতে, শত রঙে সাজিয়ে তাকে, আমায় ...

পিচ্চি বলতে কিছুই নেই,সবাই সব কিছু বোঝে..

০৫-০৭-২০১০ মেয়েটির নাম রিহা,সাদিয়া রিহা। বয়সে আমার বছর তিনেক ছোট হবে। ছোট মেয়েদের উপর ক্রাশ খাওয়ার মত এত বড় বিড়ম্বনা আর নেই। যেই মেয়েটি ভাইয়া ভাইয়া বলে গলা ফাটায় তাকে কখনো ভালোবাসার কথা বলা যায়? তাকে ভালোবাসাটাও তো অন্যায়। আর আমি সে অন্যায়ই করেছিলাম। আজকে সেই গল্পই বলছি। ভালো লাগতো খুব ওকে কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলা হয় নি পাছে ওর মনে একটা বিরূপ ধারনা জমে এই ভেবে যে যাকে বড় ভাইয়া বলে ভাবলাম এতদিন আজ সে ও ভালোবাসার কথা বলছে!!! তাই আর কখনো বলা হয়নি ভালোবাসার কথা। ওর সাথে প্রতিদিন দেখা হতো। আমি রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে থাকতাম,ও কলেজে যেত। কিংবা আমি যখন বিকেলে বাসার সামনের গলিতে ক্রিকেট খেলতাম,ও কোচিং থেকে ফিরতো। যতবার দেখা হতো ততবারই কথা হতো। ও নিজে থেকেই বলতো। এই যেমন "কি ভাইয়া, আজকে কি হাফ সেঞ্চুরি হবে?" অথবা "রেড টি শার্টে তো আপনাকে দারূণ লাগে ভাইয়া।" আমি ও হেসে উত্তর দিতাম। মাঝেমাঝে মজা করতাম,এই যেমন, "কি প্রতিদিনই কি তোমার কোচিং থাকে? নাকি কারো সাথে দেখা করতে যাও।" ভালো একটা সম্পর্কই ছিল বলা চল...