পঞ্চম অধ্যায় | যে ঘরে জায়গা হলো, যে জীবনে হলো না
সন্ধ্যায় আরিয়ান নিজের ঘরে ফিরে এল।
বিড়ালটি বিছানায় বসে ছিল। আরিয়ান তার কাছে গিয়ে আদর করতে চাইল।
বিড়ালটি আবারও খামচি দিল।
"আহ! আবার!"
আরিয়ান হাত সরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ বিড়ালটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
"তুই কি কোনোদিন আমাকে একটু শান্তি দিবি না?"
বিড়ালটি জানালার দিকে চলে গেল।
আরিয়ান বিছানায় বসে পড়ল।
ঘরটি সুন্দর। বিছানাটি নরম। খাবারের পাত্র ভর্তি। বিড়ালটির জন্য সবকিছু আছে।
তবু কোথাও যেন শান্তি নেই।
সে হঠাৎ ভাবল, নিরু থাকলে হয়তো এখন তার পায়ের কাছে বসে থাকত। কোনো অভিযোগ করত না। খাবার চাইত না। শুধু একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা করত।
কিন্তু নিরু নেই।
আর থাকলেও তাকে এই ঘরে ঢুকতে দেওয়া হতো না।
কারণ তার গায়ের লোমে ধুলো লেগে আছে। পায়ে রাস্তার কাদা। শরীরে পথের গন্ধ।
সে আরিয়ানের পরিবারের সামনে মানানসই নয়।
আত্মীয়দের সঙ্গে ছবি তোলার মতো সুন্দর নয়।
সামাজিক পরিচয়ের জন্য উপযুক্ত নয়।
তাই তার জন্য বাড়ির দরজার বাইরে একটা পৃথিবী বরাদ্দ ছিল।
যেখানে বৃষ্টি হলে ভিজতে হবে, ক্ষুধা লাগলে খুঁজে খেতে হবে, অসুস্থ হলে একা পড়ে থাকতে হবে।
আর যখন আরিয়ানের মন খারাপ হবে, তখন একটা ডাক শুনে আবার ফিরে আসতে হবে।
আরিয়ান জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে। কোথাও নিরু নেই।
সে নিচু স্বরে বলল,
"নিরু, তুই কোথায় গেলি রে?"
কোনো উত্তর এল না।
ঘরের ভেতর বিড়ালটি আবার একটা পাত্র ফেলে দিল।
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
"আবার কী করলি!"
তারপর সে পাত্রটি তুলতে নিচু হলো।
বাইরে তখন রাত আরও গভীর হচ্ছে।
হয়তো কোনো এক ডাস্টবিনের পাশে নিরু শরীর গুটিয়ে শুয়ে আছে। হয়তো কোনো দোকানের বারান্দায় একটু আশ্রয়ের অপেক্ষায় আছে। হয়তো কোনো অচেনা মানুষ তাকে এক টুকরো রুটি দিয়েছে।
কিন্তু তার নিজের বলে কোনো ঘর নেই।
কোনো নির্দিষ্ট দরজা নেই।
কেউ তাকে রাতে খুঁজে দেখে না।
কেউ তার জন্য জানালা খুলে রাখে না।
আর সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, যে মানুষটিকে সে নিজের পৃথিবী ভেবেছিল, সেই মানুষটির পৃথিবীতেই তার কোনো জায়গা ছিল না।
রাতের অস্বস্তি
সেদিন রাতে আরিয়ান ঘুমাতে পারছিল না।
বিড়ালটি তার বিছানার ওপর উঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কখনো পর্দা টানছিল, কখনো বালিশে থাবা দিচ্ছিল।
"এই! একটু শান্ত হয়ে থাক না!"
এই বিড়ালটিকে নিয়েই কি প্রতিদিনের সংসার?
এমন একটি সঙ্গী, যার সঙ্গে থাকতে হবে, অথচ যার কাছ থেকে শান্তি পাওয়া যাবে না?
তার মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়তো সে করে ফেলেছে।
অথচ যে প্রাণীটি একসময় তার কাছ থেকে কিছুই চাইত না, তাকে সে কখনো নিজের ঘরে জায়গা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেনি।
একদিন রাতে আরিয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের আঁচড়গুলো দেখছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো, সে আসলে কী চেয়েছিল?
একজন সঙ্গী, নাকি এমন একজন সঙ্গী, যাকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়ে রাখা যাবে? যে দেখতে সুন্দর হবে, অন্যদের প্রশংসা পাবে, কিন্তু কখনো তার প্রত্যাশার বাইরে যাবে না?
কিন্তু জীবনের সঙ্গী তো কোনো সাজসজ্জার বস্তু নয়।
বাইরে তখন নিরু হয়তো আরেকটি ডাস্টবিনের পাশে ঘুমাচ্ছিল।
আরিয়ান জানালার পর্দা টেনে দিল।
সে নিরুকে হারিয়ে কষ্ট পায়নি। তার কষ্ট ছিল, নিজের পছন্দের মানুষটিকে নিয়ে বাকি জীবন কীভাবে কাটাবে।
"হয়তো নিরুকে না পাওয়ার কষ্টের চেয়ে নিজের ভুল পছন্দের সঙ্গে সারাজীবন বেঁচে থাকার ভয় অনেক বেশি।"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন