প্রথম অধ্যায় | একটি ডাকের অপেক্ষায়
"নিরু! এই নিরু! এদিকে আয়, সোনা!"
ডাকটা শোনা মাত্রই নিরু মাথা তুলে তাকাল। মুখের সামনে পড়ে থাকা আধখাওয়া রুটির টুকরোটা ফেলে সে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। তারপর লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে গেল রাস্তার ওপারে।
কয়েক মুহূর্ত আগেও বৃষ্টির পানিতে ভেজা ফুটপাতের এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল সে। শরীরের লোমগুলো কাদায় মাখামাখি, পেটটা ক্ষুধায় প্রায় পিঠের সঙ্গে লেগে গেছে। পাশেই একটা উপচে পড়া ডাস্টবিন। সারারাত সেখানেই কাটিয়েছে সে। বৃষ্টি থামার পরও কেউ তাকে একবারের জন্য জিজ্ঞেস করেনি, তার খুব শীত করছে কি না।
অথচ একটা ডাকই যথেষ্ট।
"কী রে নিরু! আমাকে ভুলে গেছিস নাকি?"
আরিয়ানর পরিচিত কণ্ঠ শুনে নিরু আরও কাছে এগিয়ে গেল। মানুষটার পায়ের কাছে বসে লেজ নাড়তে লাগল। একবার পায়ের ওপর মুখ রাখল, আরেকবার মাথাটা তুলে তার মুখের দিকে তাকাল।
আরিয়ান পকেট থেকে কেকের একটা ছোট টুকরো বের করে তার সামনে ছুড়ে দিলেন।
"নে, খা। আজ তোকে কেক খাওয়াব।"
নিরু কেকের টুকরোটার দিকে তাকাল। তারপর আরিয়ানর দিকে। যেন খাবারটার চেয়েও মানুষটার মুখে হাসিটা তার কাছে বেশি মূল্যবান।
আরিয়ান ফোনে কথা বলতে বলতে তার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিলেন।
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসছি। একটু দাঁড়া।"
নিরু চুপচাপ বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।
"যা, এখন যা। পরে আবার ডাকব।"
নিরু প্রথমে বুঝতে পারল না। সে কয়েক পা এগিয়ে আবার পেছনে তাকাল। আরিয়ান তখন অন্যদিকে হাঁটছে। নিরু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে ফিরে গেল সেই ডাস্টবিনের পাশে।
এটা তার কাছে নতুন কিছু নয়।
আরিয়ানর যখন মন খারাপ থাকে, যখন একা লাগে, যখন পৃথিবীর আর কাউকে পাশে পাওয়া যায় না—তখন নিরুর কথা মনে পড়ে। একটা ডাক আসে, একটু খাবার জোটে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া হয়।
আর যখন আরিয়ানর চারপাশে মানুষ থাকে, বন্ধুবান্ধব থাকে, পরিবার থাকে, আনন্দ থাকে—তখন নিরুর আর কোনো প্রয়োজন থাকে না।
তখন সে কেবল একটা রাস্তার কুকুর।
নোংরা, অবাঞ্ছিত, বিরক্তিকর একটা প্রাণী।
রাত বাড়তে লাগল। রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠল। দূরে কোনো এক বাড়িতে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নিরু ডাস্টবিনের পাশে শুয়ে পড়ল। পেটের মধ্যে তখনো ক্ষুধা, শরীরে তখনো ভেজা লোমের শীত।
হঠাৎ তার মনে হলো, আজ আরিয়ান তাকে একটু বেশিই আদর করেছেন।
হয়তো কালও ডাকবেন।
এই আশাতেই সে চোখ বন্ধ করল।
পরদিন বিকেলে আরিয়ানর বাড়িতে বেশ আয়োজন। বাড়িভর্তি মানুষ, হাসি, গল্প, খাবারের গন্ধ। নিরু গেটের বাইরে বসে আছে। সকাল থেকেই সে সেখানে অপেক্ষা করছে।
মাস্টার একবার বাইরে বেরিয়ে তাকে দেখতে পেলেন।
"আরে! তুই আবার এখানে কেন? যা, যা! আজকে এখানে অনেক মানুষ আসবে। বিরক্ত করিস না।"
একটা ছোট্ট লাথি এসে লাগল নিরুর শরীরে।
সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
কিন্তু চলে গেল না।
গেটের বাইরে বসে রইল। ভেতর থেকে মানুষের হাসির শব্দ আসছিল। নিরু মাঝেমধ্যে কান খাড়া করছিল। হয়তো আরিয়ান আবার ডাকবে। হয়তো খাবারের একটু অংশ দেবে।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে আরিয়ানর কণ্ঠ ভেসে এল—
"ওই কুকুরটাকে কেউ একটু সরিয়ে দাও তো! একদম নোংরা করে রেখেছে জায়গাটা।"
নিরু মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল পরিচিত সেই রাস্তার দিকে।
কিন্তু সে জানত না, আজ রাতেই এমন একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, যা তার এত দিনের অপেক্ষার অর্থ বদলে দেবে।
কারণ রাত বারোটার দিকে, যখন পৃথিবীর প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন আবারও সেই পরিচিত ফোনটি বেজে উঠবে।
আর ওপাশ থেকে ভেসে আসবে সেই চেনা কণ্ঠ—
"নিরু, কোথায় তুই? আয়, আজ তোকে খুব দরকার..."

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন