নিজের সাথে কথোপকথন
সময়—একটি দীর্ঘ রাত, কিছু দীর্ঘশ্বাস এবং নিজের কাছে ফিরে আসার এক অসম্ভব দেরি।
আজ নিজের সঙ্গে বসেছি।
কোনো অভিযোগ নিয়ে নয়, কোনো হিসাব মেলাতেও নয়—শুধু নিজের কাছে নিজের কিছু অবিচারের গল্প বলতে।
রাত যত গভীর হচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে মানুষ আসলে অন্যের কাছে নয়, সবচেয়ে বেশি অপরাধী নিজের কাছেই। দিনের আলোয় যেসব প্রশ্নকে ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে রাখা যায়, রাতের নৈঃশব্দ্য সেসব প্রশ্নকে একে একে সামনে এনে বসিয়ে দেয়।
একটার পর একটা সিগারেট পুড়ছে।
তার সঙ্গে যেন পুড়ছে আমার সত্তাটাও।
সত্তার পোড়া গন্ধ অবশ্য নাকে আসছে না; সিগারেটের প্রকট ধোঁয়াই শুধু জানান দিচ্ছে—নিজেকে পুড়িয়ে ফেলারও একটা শব্দহীন ইতিহাস আছে।
হয়তো সিগারেটটা আসলে আমার হাতে জ্বলছে না;
জ্বলছি আমি—আর ধোঁয়াটা শুধু তার দৃশ্যমান প্রমাণ।
⸻
ভালোবাসার খেলায় আমি জিতেছিলাম, নাকি হেরে গিয়েছিলাম—সে প্রশ্ন এখন অতীতের।
বরং আজ অন্য একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে—
-আমি কি কোনোদিন নিজেকে ভালোবেসেছিলাম?
সত্যি বলতে, জানি না।
এখন বরং সন্দেহ হয়—হয়তো কোনোদিনই ভালোবাসিনি।
যার চোখে আমার জন্য ভালোবাসা দেখেছি, তাকেই সমস্তটুকু দিয়ে ভালোবাসতে গিয়েছি। অথচ একবারও ফিরে তাকাইনি নিজের দিকে। যে মানুষটি প্রতিদিন আমার সঙ্গে ছিল, আমার সমস্ত সুখ-দুঃখের সাক্ষী ছিল—সেই মানুষটিই তো আমি নিজে।
কিন্তু তাকে আমি কখনো জিজ্ঞেস করিনি—
“কেমন আছো?”
জিজ্ঞেস করিনি,
আমার নিজের সত্তা কেমন আছে,
আমার ভেতরের মানুষটি কতটা ক্লান্ত,
আমার দিনগুলো কীভাবে যাচ্ছে,
আমার রাতগুলো কেন এত দীর্ঘ হচ্ছে।
⸻
হুমায়ূন আহমেদের একটি সংলাপ আজও মাথার ভেতর ঘুরে বেড়ায়—
হয়তো এই একটি বাক্যই কোনো একসময় আমার ভালোবাসার দর্শন হয়ে উঠেছিল।
আমার মতো তুচ্ছতম একজন মানুষকেও যে ভালোবাসার সাহস দেখিয়েছিল, তার প্রতিদানে তাকে জীবনভর ভালোবেসে যাব—এই ব্রতটুকু বুকের ভেতর এমনভাবে আগলে ধরেছিলাম, যেন ভালোবাসা মানেই নিজেকে বিসর্জন দেওয়া।
কিন্তু আজ মনে হয়—
ভালোবাসা কি সত্যিই আত্মবিসর্জনের অন্য নাম?
নাকি ভালোবাসা এমন এক আশ্রয়, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরকে হারিয়ে না ফেলে বরং নিজেদের আরও গভীরভাবে খুঁজে পায়?
আমি হয়তো সেই পার্থক্যটা বুঝিনি।
⸻
বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সময়টা রঙিন হওয়ার কথা ছিল, তার কতটা আমি অন্ধকার ঘরে কাটিয়েছি!
যে বয়সে বন্ধুত্ব, আড্ডা, হাসি আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভরে থাকার কথা ছিল—সে বয়সে আমি উদ্বাস্তুর মতো পথের পর পথ হেঁটেছি।
কখনো কোনো গন্তব্য ছিল না।
রাতের পর রাত খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। তারাদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে—হয়তো ভালোবাসা এমনই।
হয়তো ভালোবাসা মানে অপেক্ষা।
হয়তো ভালোবাসা মানে নিজের ভেতর প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙা।
হয়তো ভালোবাসা মানে কাউকে ধরে রাখতে গিয়ে নিজের হাতটাই রক্তাক্ত করে ফেলা।
কিন্তু আজ বুঝি—
সব অপেক্ষার শেষ প্রাপ্তি নয়,
সব ভালোবাসার শেষ মিলন নয়,
আর সব ত্যাগের শেষ পুরস্কারও নেই।
কিছু কিছু ভালোবাসা জীবনে আসে আমাদের পাওয়ার জন্য নয়
- আমাদের বদলে দেওয়ার জন্য।
কিছু মানুষ আসে থাকার জন্য নয়,
আমাদের ভেতরে এমন কিছু রেখে যাওয়ার জন্য, যা তাদের চলে যাওয়ার পরও থেকে যায়।
⸻
আমি নিজেকে একটু একটু করে ভেঙেছি।
প্রথমে সামান্য,
তারপর আরও একটু...।
তারপর একদিন বুঝলাম—আমি আর আমার পাশে নেই।
নিজের কাছ থেকে নিজেই এত দূরে সরে গেছি যে, আয়নায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকেও অপরিচিত মনে হয়।
ভালোবাসা খুঁজতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি।
শেষ পর্যন্ত—
না পেলাম ভালোবাসা,
না পেলাম নিজেকে।
যে ভালোবাসাকে এতটা পেতে চেয়েছিলাম, হয়তো সেটি কোনোদিনই আমার সাধ্যের মধ্যে ছিল না।
⸻
আজ নিজের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগে। নিজের কাছে আমার কোনো উত্তর নেই।
আমি নিজেকে কষ্ট ছাড়া আর কী দিয়েছি?
দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছি।
কান্না আটকে হাসতে হাসতে বিদায় দেওয়ার অভ্যাস দিয়েছি। আচমকা কোনো দুঃসংবাদকে মুখে কোনো রেখাপাত না করে হজম করে ফেলার শিক্ষা দিয়েছি।
নিজের চাওয়াগুলোকে বারবার গলা টিপে হত্যা করে, অন্যের চাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার অভ্যাস করেছি।
আর প্রতিবারই হাসিমুখে ফিরে এসেছি।
যেন কিছুই হয়নি।
যেন আমার ভেতরে কোনো মানুষ বাস করে না।
⸻
কিন্তু মানুষ কি সত্যিই এতটা শক্ত?
নাকি আমরা শুধু শক্ত হওয়ার অভিনয় করতে করতে একদিন সত্যিই ভেঙে পড়ি?
আমি জানি না।
শুধু জানি, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছি।
নিজের শরীরকে অবহেলা করেছি।
নিজের মনকে উপেক্ষা করেছি।
নিজের কান্নাকে দুর্বলতা ভেবেছি।
নিজের প্রয়োজনকে স্বার্থপরতা ভেবেছি।
নিজেকে ভালোবাসতে চাওয়াকে অপরাধ ভেবেছি।
আমি তো তাদের কোনোদিন কিছুই দিইনি।
আমার মানসিক স্বাস্থ্য আর শারিরীক স্বাস্থ্যের উপর এখন আর হাত দেয়ার অধিকার টুকুই যেন আমার নেই।
নিজের শরীর, নিজের মন আমাকে পরিত্যাগ করেছে। আমি তাদের কিছুই দিতে পারিনি, কিছুই না।
⸻
প্রাপ্তি বলতে হয়তো দিনশেষে আমি কারো পরিচয়বিহীন এক গোপন ভালোবাসা হয়ে থাকব।
অথবা, স্মৃতির কোনো অন্ধকার কোণে পড়ে থাকা একটি নাম।
কেউ হয়তো কোনোদিন আমাকে মনে করবে, কিন্তু আমার নামটি উচ্চারণ করবে না।
হয়তো আমার অস্তিত্ব কোনো মানুষের জীবনে একটি অসমাপ্ত বাক্যের মতো থেকে যাবে।
কিন্তু সেই পরিচয় কি আমি নিতে পারব?
আমি হয়তো তা মেনে নেব।
মানুষ তো অনেক কিছুই মেনে নেয়।
কিন্তু আমার ভেতরের যে মানুষটি এতদিন নীরবে সব সহ্য করেছে, এতকিছুর পর এই পরিচয়টা
সে কি মেনে নেবে?
সে কি আবার আগের মতো আমার আদেশে চলবে?
আমার ইচ্ছা মতো কষ্ট লুকিয়ে স্বাভাবিক থাকবে? কিছু হয়নি, ব্যাপার না! বলে চালিয়ে নিতে পারবে?
সেই উত্তরটি আমার সত্তাই না হয় দিক,
আমি বরং থেমেই যাই।
⸻
আজ তাই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।
কাউকে দোষ দিতে চাই না।
ভালোবাসাকেও অভিশাপ দিতে চাই না।
কারণ ভালোবাসা আমাকে যতটা ভেঙেছে, তার চেয়েও বেশি আমি নিজেই নিজেকে ভেঙেছি।
অন্য কেউ আমাকে যতটা কষ্ট দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট আমি নিজেকে দিয়েছি— অন্যের জন্য।
এবং এটাই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ।
Just Like Dostoevsky said-
আজ রাতের এই কথোপকথনের শেষে কাউকে নয়, শুধু নিজেকেই একটি কথা বলতে চাই—
“এবার একটু নিজের পাশে দাঁড়াও।”
সবাইকে ভালোবাসার আগে একবার নিজেকে ভালোবাসো।
সবাইকে ক্ষমা করার আগে নিজেকেও ক্ষমা করো।
সবাইকে ধরে রাখার আগে নিজের হাতটা নিজের হাতেই রাখো। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সম্পর্কটি অন্য কারো সঙ্গে নয়— নিজের সঙ্গে।
মানুষ সারাজীবন অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করে, অনেককে ভালোবাসে, অনেককে হারায়। কেউ আসে, কেউ চলে যায়, কেউ স্মৃতি হয়ে থাকে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে মানুষটির সঙ্গে একই ঘরে, একই শরীরে, একই নিঃশ্বাসে সারাজীবন কাটাতে হয়—
সে মানুষটি নিজেই।
তাই হয়তো নিজেকে হারিয়ে কোনো ভালোবাসাই পূর্ণ হয় না।
আজ আমি থামছি।
পরাজিত হয়ে নয়,
জয়ী হয়েও নয়।
শুধু নিজের সামনে দাঁড়িয়ে—
মাথা নিচু করে।
হয়তো আমার সত্তা আমাকে ক্ষমা করবে না।
হয়তো করবে।
তার উত্তর আজ না হয় সে-ই দিক।
আমি বরং আজ প্রথমবারের মতো চুপ করে থাকি।
একটা দীর্ঘ রাতের শেষে,
কিছু দীর্ঘশ্বাসের পাশে,
একটা অন্ধকার ঘরে—
নিজের সঙ্গে নিজের এই কথোপকথনটুকু অসমাপ্তই থাক।
কিছু প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।
কিছু উত্তর পেতে হয়—
বেঁচে থেকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন